এসাইনমেন্ট

১০ম শ্রেণির (এসএসসি ২০২২) বাংলা চতুর্থ সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট

এসএসসি বাংলা চতুর্থ সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট ২০২২

১০ম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের বাংলা চতুর্থ সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট (এসএসসি ২০২২ পরীক্ষা) প্রকাশিত হয়েছে। এখানে আমরা সেই বাংলা চতুর্থ সপ্তাহের এসাইনমেন্টর সকল প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

১০ম শ্রেণির (এসএসসি ২০২২) বাংলা চতুর্থ সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট

শ্রেণিঃ দাখিল দশম, বিষয়ঃ বাংলা ১ম পত্র, অ্যাসাইনমেন্ট নম্বরঃ ২

অ্যাসাইনমেন্ট বা নির্ধারিত কাজঃ বঙ্গবাণী কবিতার আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব মূল্যায়ন;

শিখনফলঃ কবিতা পড়ে তার মূলভাব বিশ্লেষণ করতে পারবে।

অ্যাসাইনমেন্ট লেখার নির্দেশনা ( সংকেত/ধাপ/পরিধি):

১. কবি আবদুল হাকিমের মাতৃভাষায় গ্রন্থ রচনায় কারণ।

২. মাতৃভাষা বিদেশিদের প্রতি কবির মনোভাব।

৩. সাধারণ কথোপকথন, বইপত্র, সাইন, ব্যানার, সংবাদ ও গণমাধ্যম ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভাষার অপপ্রয়োগ এর বিভিন্ন দৃষ্টান্ত উপস্থাপন। ( প্রয়োজনের ছবি ও পেপার কাটিং যুক্ত করা)

৪. মাতৃ ভাষার অপপ্রয়োগ কমাতে এবং যথাযথ প্রয়োগ বাড়াতে একই ধরনের ভূমিকা রাখা যায়, এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা তৈরি।

‘বঙ্গবাণী’ কবিতার আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব মূল্যায়ন

ভাষা যোগাযোগের এমন একটি ব্যবস্থা, যা একগুচ্ছ শব্দ এবং লিখিত প্রতীকের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের লোকেরা কথা বলতে বা লেখার জন্য ব্যবহার করে। মাতৃভাষা আসলে সেই ভাষাটি, যেখানে কোনো শিশু কোনো শব্দ বুঝতে শুরু করার আগে তার সঙ্গে কথা বলে। এটি এমন একটি প্রভাবশালী ভাষা, যা প্রকৃতপক্ষে একজন ব্যক্তির চিন্তাধারাকে সংজ্ঞায়িত করে।

‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটি কবি আবদুল হাকিমের ‘নূরনামা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে। মধ্যযুগীয় পরিবেশে বঙ্গভাষী এবং বঙ্গভাষার প্রতি এমন বলিষ্ঠ বাণীবদ্ধ কবিতার নিদর্শন দুর্লভ।
কবি ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় তাঁর গভীর উপলব্ধি ও বিশ্বাসের কথা নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করেছেন। আরবি ফার্সি ভাষার প্রতি কবির মোটেই বিদ্বেষ নেই। এইসব ভাষায় আল্লাহ ও মহানবীর স্মৃতি বর্ণিত রয়েছে। তাই এসব ভাষার প্রতি সবাই পরম শ্রদ্ধাশীল। যে ভাষা জনসাধারণের বোধগম্য নয়, যে ভাষায় অন্যের সঙ্গে ভাব বিনিময় করা যায় না সেসব ভাষাভাষী লোকের পক্ষে মাতৃভাষায় কথা বলা বা লেখাই একমাত্র পন্থা। একারণেই কবি মাতৃভাষায় গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করেছেন।

তৎকালীন এ দেশের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিছু রক্ষণশীল গোঁড়া ব্যক্তিবর্গ তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে আরবি-ফারসির প্রতি গভীর অনুরাগ দেখাতে থাকে। কূপমণ্ডূকতার কারণে তারা মনে করত, কোরআন-হাদিসের ভাষা যেহেতু আরবি, কাজেই আরবি-ফারসি ভাষা ছাড়া আল্লাহ-রাসুলের সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়। তা ছাড়া এ দেশের প্রাচীন অধিবাসী ছিল হিন্দু এবং তাদের ভাষা ছিল বাংলা। বাংলা বর্ণমালাগুলো এসেছে ব্রাহ্মীলিপি থেকে, যা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের তৈরি করা। তাই মুসলমান হয়ে এ ভাষাকে ভালোবাসা সম্ভব নয়। এ কারণে তারা বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করে হিন্দুর অক্ষর বলত।

‘বঙ্গবাণী’ শব্দটির অর্থ বাংলা ভাষা। এমন এক সময় ছিল যখন মুসলিম সমাজ বাংলাভাষাকে ধর্ম ও জ্ঞান চর্চার বাহন হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। আব্দুল হাকিম মধ্যযুগের কবি। কিন্তু আশ্চর্য স্বাভাবিক বুদ্ধিতে তিনি এর ভ্রান্তি বুঝতে পেরেছিলেন। এ ভ্রান্তির কথাই তিনি বলেছেন ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায়। এ কবিতায় কবি মাতৃভাষা ও স্বদেশের গুণগান গেয়েছেন। কবির মতে, মানুষ মাত্রই নিজ ভাষায় স্রষ্টাকে ডাকে আর স্রষ্টাও মানুষের বক্তব্য বুঝতে পারেন। কবির চিত্তে তীব্র ক্ষোভ এজন্য যে, যারা বাংলাদেশের জন্মগ্রহণ করেছে, অথচ বাংলা ভাষার প্রতি তাদের মমতা নেই, তাদের বংশ ও জন্ম পরিচয় সম্পর্কে কবির মনে সন্দেহ জাগে।

কবি সখেদে বলেছেন, এসব লোক, যাদের মনে স্বদেশের ও স্বভাষার প্রতি বিন্দুমাত্র অনুরাগ নেই তারা কেন এদেশ পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায় না! বংশানুক্রমে বাংলাদেশেই আমাদের বসতি, বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি এবং মাতৃভাষায় বর্ণিত বক্তব্য আমাদের মর্ম স্পর্শ করে। এই ভাষার চেয়ে হিতকর আর কি হতে পারে!

মহান ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক ধারণা থেকে আমরা বলতে পারি, ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষার এই আন্দোলনের প্রধানত উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষা বাংলার অবাধ ব্যবহার ও তার সার্বিক উৎকর্ষ বিধান এবং সর্বস্তরে চর্চার অধিকার আদায় করা। অপর উদ্দেশ্যটি ছিল মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতসহ রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানে এর যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বাতন্ত্র্য-স্বকীয়তা বজায় রাখা ও সারাবিশ্বে এ ভাষার পরিচিতি আরও উন্নত পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া। সে জন্যই আমাদের ভাষা আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।

ভাষা আন্দোলনের আরেকটি মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল জাতি হিসেবে বাঙালির সব গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার। কেননা, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির মুখের ভাষার পরিবর্তে সংখ্যালঘিষ্ঠ কোনো জাতির ভাষা এখানে চাপিয়ে দেওয়া কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; বরং তা সভ্যতা ও মূল্যবোধের চরম পরিপন্থি। এ রকম একটি অগণতান্ত্রিক, অন্যায় ও মানবাধিকার পরিপন্থি বিষয়ের তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে গিয়েই মহান ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল; যা পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতির জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সব বৈষম্য দূরীকরণে পর্যায়ক্রমে এক ঐতিহাসিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এ ক্ষেত্রে অমর একুশের অকুতোভয় বীর শহীদদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

মহানবী (সা.) ছিলেন আরবের সবচেয়ে সুন্দর ও শুদ্ধভাষী। তিনি কোনোদিন একটি অশুদ্ধ বা বিকৃত শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করেননি। আমাদের মাতৃভাষা বাংলার প্রতি শহীদদের অবদান এবং মহানবীর (সা.) মাতৃভাষাপ্রীতির অজস্র নজির সামনে রেখে এ বিষয়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। ইতিহাসের আলোকে আমরা দেখতে পাই, আরবের অধিবাসীদের নীতিবিধান, জীবনবোধ ও সামগ্রিক আচার-পদ্ধতি সহজে বোঝানোর জন্যই আরবি ভাষাতে কোরআন নাজিল হয়েছিল। আর তা আল্লাহপাকের এক বাণীতেও পরিস্কার অনুধাবন করা যায়- ‘আমি একে আরবি ভাষায় কোরআনরূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা সহজে বুঝতে পার (১২ :২)।’

মহান আল্লাহর এ নির্দেশনার আলোকে আমাদেরও উচিত সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার যথার্থ প্রচলন এবং বাংলা ভাষার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি আনয়ন। বাংলা ভাষার কবি-লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, প্রতিবেদকসহ সংশ্নিষ্ট সবার উচিত- তাদের রচনায় আমাদের শিশু-কিশোরসহ অল্পশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষের সহজে বোধগম্য হয় এমন শব্দাবলির ব্যবহার করা। ভিন্ন ভাষায় রচিত গ্রন্থাদি সহজবোধ্য ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে উপস্থাপন বাঞ্ছনীয়। ধর্মীয়, নৈতিক ও শিল্প-সাহিত্য সম্বন্ধীয় সব রচনা মাতৃভাষায় রূপান্তর হওয়া প্রয়োজন, যাতে ইসলামকে বুঝতে সহজ হয়, নৈতিক জ্ঞানে মানুষ গুণান্বিত হয় এবং বিদেশি রচনাবলির স্বাদ বাংলায় আস্বাদন করতে সক্ষম হয়।

মাতৃ ভাষার অপপ্রয়োগ কমাতে এবং যথাযথ প্রয়োগ বাড়াতে যে ব্যবস্থাগুলো নিতে হবে :

  • জাতীয় শিক্ষানীতিতে বাংলাকে উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারে বাধ্যতামূলক করা;
  • বাংলা শব্দভাণ্ডার উন্নত করা;
  • উচ্চ শিক্ষায় প্রয়োজনীয় গ্রন্থগুলোর বাংলায় অনুবাদের ব্যবস্থা গ্রহণ;
  • বাংলাভাষার জন্য গবেষণাকেন্দ্রের সক্রিয় ভূমিকা ও কার্যক্রম;
  • শৈল্পিক, ব্যাকরণগত ও লিখিত রূপে সহজবোধ্যতা আনা;
  • বাংলাভাষার ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রবাসী বাংলাভাষী ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপন;
  • সর্বস্তরে বাংলাভাষার নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য প্রচলন;
  • বাংলাভাষার গুরুত্ব বোঝাতে সবার মাঝে সচেতনতা বাড়ানো;
  • বাংলা সংস্করণে বেশি বেশি কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি করা এবং বাংলাভাষাকে দ্রুত প্রযুক্তিবান্ধব করতে উদ্যোগী হওয়া।

সুতরাং মাতৃভাষা মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলার সেরা দান বা অনুগ্রহ। তাইতো ভাষা নিয়ে গর্ব করা যায়। মাতৃভাষার চর্চা ও একে উন্নত করার অধিকার সবার একান্ত কর্তব্য। মাতৃভাষা চর্চা ও রক্ষাও প্রত্যেকের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব।

মাতৃভাষা যে শিক্ষার সর্বস্তরে মাধ্যম হিসাবে কার্যত গৃহিত হতে পারছে না এর মূলে পণ্ডিত অধ্যাপকদের মানসিক জাড্য এবং ইংরেজি ভাষার প্রতি মােহ। বাংলায় যে সর্বোচ্চ স্তরের জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থাদি রচিত হয়নি তার দায় পণ্ডিত সমাজ অস্বীকার করতে পারবে না। জাপান-রাশিয়া-জার্মানি সূচনা থেকেই মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ স্তরের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিয়ােগ করেছেন। বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা বাংলা সে বিষয়ে অক্ষম একথা স্বীকার করা যায় না। শুধু প্রতিষ্ঠানিক বিদ্যা চর্চার ক্ষেত্রে বাংলা তথা অন্যান্য মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে রাখা লজ্জাকর। শিক্ষাকে সার্বজনীন ও উচ্চমানের করতে হলে মাতৃভাষার প্রতি এই মনােভাব অবশ্য বর্জন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button